১০০ মিলিয়ন ইউরোর চুরি: এক নিখুঁত পরিকল্পনার পতন

২০১০ সালের ২০ মে। ভোর ২টা ৪৭ মিনিট।

প্যারিস শহর তখন ঘুমিয়ে। রাস্তা নিঃশব্দ, বাতাসে হালকা ঠান্ডা। কিন্তু Musée d'Art Moderne de Paris–এর পাঁচতলা ভবনের বাইরের দেয়ালে এক মানুষ উঠছে—খালি হাতে।

কোনো দড়ি নেই। হারনেস নেই। সেফটি গিয়ার নেই।
শুধু আঙুল আর পায়ের পাতার ভরসায় পাথরের ফাঁক খুঁজে খুঁজে উপরে উঠছে সে।

একবার হাত ফসকালেই পঞ্চাশ ফুট নিচে কংক্রিটে আছড়ে পড়া—মৃত্যু নিশ্চিত।

তৃতীয় তলা।
ডান হাত সরু এক কার্নিশে গিয়ে থামে। আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে। শরীরের পুরো ওজন এক হাতে ঝুলছে। বাম পা দেয়ালের ফাঁকে ঠেলে শরীর তুলছে।

চতুর্থ তলা।
পুরনো পাথর, কিছু অংশ ঢিলা। প্রতিটা হাতল সে আগে পরীক্ষা করে, তারপর ভর দেয়। কারণ একটা ভুল মানেই শেষ।

পঞ্চম তলা।
জানালার কার্নিশ সামনে। আঙুল এগিয়ে যায়। ধরে।
এক মুহূর্তের জন্য তার পুরো শরীর এক হাতের উপর ঝুলে থাকে। বাহু কাঁপছে। মাংসপেশি জ্বলছে। তবুও সে আতঙ্কিত হয় না। ধীরে ধীরে অন্য হাত তুলে জানালায় ধরে ফেলে।

সে জানে সে কী করছে।
এটা তার প্রথমবার নয়। শতবার করেছে। ভিন্ন শহর, ভিন্ন ভবন—সবসময় রাত, সবসময় একা।

তার নাম ভিয়েরান তোমিচ।
ফরাসিরা তাকে ডাকে—স্পাইডার-ম্যান


জন্ম এক আরোহীর

১৯৬৮ সালে প্যারিসে জন্ম। ক্রোয়েশিয়ান-সার্বিয়ান অভিবাসী পরিবারের সন্তান। সাধারণ শৈশব, গরিব কিন্তু অভুক্ত নয়।

কিন্তু দশ বছর বয়সেই সে আবিষ্কার করেছিল তার নেশা—
গাছ নয়, দেয়াল।
খেলার মাঠ নয়, বহুতল ভবন।

পাঁচতলা, ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট সে উঠত শুধু মজা করে।
তার ভয় ছিল না। ছাদ থেকে নিচে তাকিয়েও হাত কাঁপত না।

বাবা-মা বলতেন,
“এটা বন্ধ করো! খুব বিপজ্জনক!”
কিন্তু সে থামেনি।

ক্লাইম্বিং তার শখ ছিল না।
ওটাই ছিল তার পরিচয়।


চোরে রূপান্তর

১৯৯৫ সাল। বয়স ২৬।
একদিন পাঁচতলার বারান্দায় উঠে সে বুঝল—
“যদি উপরে উঠতে পারি, নিরাপত্তা বলে কিছু নেই।”

ক্যামেরা দরজায় থাকে।
গার্ডরা নিচে পাহারা দেয়।
কেউ দেয়ালের দিকে তাকায় না।

সে এক অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে শুধু একটি ব্রেসলেট নেয়।
টাকার জন্য নয়।
প্রমাণের জন্য।

সেখান থেকেই শুরু।
ধনী এলাকার ফ্ল্যাটে ঢোকা, ছোটখাটো জিনিস চুরি।
পুলিশ বুঝতে পারে—এটা সাধারণ চোর নয়।

তারা ডাকনাম দেয়—স্পাইডার-ম্যান

কয়েকবার ধরা পড়ে, জেল খাটে।
কিন্তু বেরিয়েই আবার দেয়ালে ওঠে।


বড় প্রস্তাব

২০১০ সালে বয়স ৪১।
একজন আর্ট ডিলার—Jonathan Birn—প্রস্তাব দেয়।

টার্গেট: প্যারিসের আধুনিক শিল্প জাদুঘর।
পাঁচটি বিখ্যাত পেইন্টিং।
মোট মূল্য ১০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি।

সহযোগী?
জাদুঘরেরই এক নিরাপত্তাকর্মী—Jean-Michel Corvez

সে জানাল—

  • পঞ্চম তলার একটি জানালা তিন মাস ধরে ভাঙা
  • অ্যালার্ম সিস্টেম নষ্ট
  • অর্ধেক ক্যামেরা বন্ধ
  • টহলের সময়সূচিতে ফাঁক

সব পরিকল্পিত। সব সাজানো।


ক্যানভাস কাটা রাত

রাত ২:৫১।
তোমিচ দাঁড়িয়ে আছে Pablo Picasso–এর Le Pigeon aux Petits Pois–এর সামনে।

একটি সাধারণ রান্নাঘরের ছুরি বের করে।
ফ্রেমের ধার ঘেঁষে ক্যানভাস কাটতে শুরু করে।

শতবর্ষ পুরোনো চিত্রকর্ম—
যুদ্ধ বেঁচে গেছে, ইতিহাস বেঁচে গেছে—
কিন্তু আজ ছুরির নিচে নীরব।

এক এক করে সে কেটে নেয়—

  • Henri Matisse–এর La Pastorale
  • Georges Braque–এর L'Olivier près de l'Estaque
  • Amedeo Modigliani–এর La Femme à l'Éventail
  • Fernand Léger–এর Nature Morte aux Chandeliers

পাঁচটি মাস্টারপিস।
সব গুটিয়ে নেয়।
পনেরো মিনিটে শেষ।


প্রায় ধরা

ফেরার পথে দুই গার্ড সামনে।
সে এক ভাস্কর্যের আড়ালে লুকায়।

গার্ডরা ফাঁকা ফ্রেম দেখে থামে।
কাঁধ ঝাঁকায়। ভাবে হয়তো পরিষ্কারের জন্য সরানো হয়েছে।

তারা চলে যায়।

তোমিচ জানালা দিয়ে নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

চুরি সফল।


পরদিন সকাল

গ্যালারিতে ফাঁকা ফ্রেম।
পাঁচটি চিত্র উধাও।

আন্তর্জাতিক সংবাদ।
ফরাসি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্পচুরি।

কিন্তু সমস্যা শুরু তখনই।

এগুলো এত বিখ্যাত যে বিক্রি করা অসম্ভব।
যে কিনবে, সে ধরা পড়বে।

ডিলার আতঙ্কিত।
ক্রেতা পালায়।

আর তারপর—
ইতিহাসের সবচেয়ে বোকামি।

ভয়ে সে ছবিগুলো ফেলে দেয়।
ডাস্টবিনে।

বিশ্বযুদ্ধ পেরোনো শিল্পকর্ম—
মানুষের ভয়ে নষ্ট।


পরিণতি

২০১১ সালে তিনজনই গ্রেপ্তার।
২০১৭ সালে বিচার।

তোমিচ ৮ বছর।
অন্য দুজন ৬ বছর করে।

চিত্রগুলো আর কখনো পাওয়া যায়নি।


শেষ কথা

এক নিখুঁত অপরাধ।
অসাধারণ পরিকল্পনা।
অবিশ্বাস্য দক্ষতা।

কিন্তু সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল না চুরি করা—
সবচেয়ে কঠিন ছিল চুরি করা জিনিসের বোঝা বইতে পারা।

কখনও কখনও,
একটি নিখুঁত অপরাধকে ধ্বংস করে দেয় অপরাধ নয়—
ভয়।